চলমান জীবন

3

◄ চলমান জীবন ►

ঘুম থেকে উঠেই বুঝলাম কিছু একটা গণ্ডগোল হইছে। কেমন কেমন যেন লাগছে। মনে হচ্ছে মাথাটা কেউ খামচি দিয়ে ধরে রাখছে। চোখ পিটপিট করে কাহিনী বুঝার চেষ্টা করলাম। বুঝলাম জ্বর আসছে। ধ্যাত, দুইদিন পর পর জ্বর আসে কেন! আসলে ভালো কিছু আয়না বাপ!

বিছানা ছেড়ে পিসির দিকে হাত বাড়ালাম। স্ট্যান্ডবাই হয়ে গেছে। রাতে না অফ করেই ঘুমাই গেছিলাম। এই জিনিসটা প্রায়ই হয়। আজ আর পিসিতে বসতে ইচ্ছে করছে না। অফ করে দিলাম। ঠিক করে ফেললাম আজ ঘুরতে বের হব।

মুখ ধুয়ে গত বৈশাখের পাঞ্জাবীটা পরে বের হলাম। কোথায় যাওয়া যায় ভাবছি। একা ঘুরতে গেলে এই একটা সমস্যা। গন্তব্য ঠিক করতে হয়। দুইজনে এই সমস্যা নেই। একদিকে যাত্রা শুরু করলেই হয়। আর যদি এর বেশি মানুষ হয় তাহলেতো আরো ঝামেলা। কই যাবে ঠিক করতেই বিশাল ক্যাচাল। নাহ, ভার্সিটির দিকেই যাই। অনেক দিন যাওয়া হয় না। অনেক নতুন নতুন মুখ আসছে এখন ভার্সিটিতে। দেখতে ভালোই লাগার কথা। নতুন সবসময় ভালো লাগে। বিশাল ধ্বংসস্তূপের দিকেও মানুষ কিছুক্ষণের ভালোলাগা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। এটা মানুষের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। হাটা ধরলাম ভার্সিটির পথে। আজ আর গাড়িতে উঠবো না। যান্ত্রিকতা মুক্ত থাকতে ইচ্ছে করতেছে।

বর্তমান গন্তব্য ঠিক করতে পেরে ভালোই লাগছে। ১০টাকার বাদাম কিনলাম। আগেও কোথাও একা যাওয়ার সময় বাদাম কিনে খেতাম। এখনও কিনি। জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়ে গেছে, কিন্তু বাদাম এখনও টিকে আছে। মানুষ ঘর থেকে বের হলেই তার গন্তব্য ঠিক করে ফেলে। দিনশেষে কাজ করে কোথায় ফিরবে ঠিক করে ফেলে সে। যাদের ঘর নাই, রাস্তায় থাকে তারাও গন্তব্য ঠিক করে। তারা রাস্তায় যে জায়গায় থাকে সবসময় সে জায়গায় থাকতে চায়। এটা তাদের এক অলিখিত মালিকানা বলা যায়। সারাদিন এখানে ওখানে টইটই করে শেষে সেই একই জায়গায় এসেই ঘুমবে বউ বাচ্চা নিয়ে।

নাস্তাটা করা দরকার। কিন্তু কোন ইচ্ছে হচ্ছে না। রাস্তায় দেখি একটা জটলা। উঁকিঝুঁকি মেরে কিছুক্ষণ দেখার চেষ্টা করলাম। এলাকার পোলাপানদের সাথে আর এক ছেলের মারামারি। পাশে দেখি একটা মেয়ে দাড়াই আছে। মেয়েটা এলাকার না বাইরের ঠিক বুঝলাম না। সমাজে বিনোদনের বড়ই অভাব। এমন বিনোদন দেখলেই সবাই দাড়াই যায়। বিনে পয়সায় নাটক সিনেমা দেখে নেয়। আমি কিছুক্ষণ দেখলাম। তেমন কিছু না বুঝে ক্ষান্ত দিলাম।

মাথা ব্যথাটা আরও বাড়তেছে। পাশের একটা ছোট্ট টঙে বসে চা,বিস্কিট খেলাম। বিস্কিট আবার আমার খুব ভালো লাগে। এই জিনিসটাকেও কেন জানি ছাড়তে পারি না। বিস্কিট খেতে খেতে দুইটা জ্ঞান লাভ করলাম।
১. তুমি যতই গন্তব্য ঠিক করনা কেন, আসল গন্তব্য উপরওয়ালা ঠিক করে রাখছেন।
২. আজ কালকার পোলাপান আমও বুঝেনা জাম ও বুঝেনা, বুঝে শুধু মাইয়া।
কিছুক্ষণ চেষ্টা করে মাইয়া কাহিনী বুঝলাম। রাস্তায় জটলার কাহিনীও বুঝলাম।

গন্তব্য পরিবর্তন করবো কিনা ভাবতেছি। ভার্সিটি পর্যন্ত আর হেটে যেতে ইচ্ছে করছে না। ওখানেও সব আজ কালকের যুগের পোলাপান। তার থেকে সলিম মিয়ারে দেখে আসি। তার খুপরি কাছেই।

সলিম মিয়া আমার থেকে ৫-৬ বছরের বড় হবে। ভিক্ষা করে খায়। আগে রিক্সা চালাইত। অ্যাকসিডেন্টে এক পা কাটা যায়। একবার তার পিচ্চি মেয়ের অনেক সখ হইছিলো আইসক্রিম খাওয়ার। বাবার লুঙ্গি ধরে কান্নাকাটি। বাবা আর কি করবে অসহায় চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। বাপ মেয়েরে আইসক্রিম কিনে দিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করে কিসের আইসক্রিম। বললাম আমি A+ পাইছিতো, তাই সবাইরে আইসক্রিম খাইয়াইতেছি। বলে মিছা কথা কন কেন, রেজাল্ট তো মেলা আগে দিছে। আমি তার দিকে তাকাইয়ে হেসে বললাম, যখন আমার মেয়ে হবে তখন তুমিও আইসক্রিম কিনে দিও। শোধবোধ হয়ে যাবে। সলিম মিয়া অসহায় হয়ে বলে, আপনার মেয়ে খাইবো ফকিরের টাকায় কেনা আইসক্রিম? আমি বললাম খাবেনা কেন? আইসক্রিম তো আইসক্রিমই। সেই থেকে পরিচয় সলিম মিয়ার সাথে।

মাঝে মাঝে দেখা হয় তার সাথে। সারাদিন রাস্তার মোড়ে ভিক্ষা করে। ভিক্ষা করে রাতে খুপরিতে ফিরে। খুপরিটাও তার না। এক রিক্সাওয়ালা ঢাকায় রিক্সা চালাতে যাওয়ার সময় তারে দিয়া গেছে। এখন বাপ বেটি ওখানেই থাকে।
– সলিম ভাই, বাড়িতে কি কর? আজ ভিক্ষা করতে যাওনাই কেন?
– একটু পরে যাইতাম ভাইজান। আপনে এইহানে যে?
– তোমাদের দেখতে আসলাম। আর নাস্তা করতে আসলাম। নাস্তা আনানো যাবে? আমি টাকা দিচ্ছি।
– ভাইজান আমারে হুদাই শরম দেন। আজ আমি আপনারে নাস্তা খাওয়াই। নাকি গরীবের নাস্তা খাইবেন না?
– আব্বা চাচায় খাইবো। আপনে দেন চাচারে।- সলিম ভাইয়ের মেয়ে বলে।
নাস্তা থেতে ভালোই লাগলো। সলিম মিয়া ভালোই চিড়া বসাইতে পারে। জ্বরটা আরও বাড়ছে মনে হচ্ছে। চিড়ার জন্য না, জ্বরের জন্য বুঝলাম না। ঘুম আসতে লাগলো খুব। সলিম মিয়া শরীরটা ভালো লাগতেছেনা।
– ভাইজান?
– হু..
– মেয়েটারে নিয়ে বড়ই চিন্তা হয়। বড় হইতাছে। আমিতো কোন রকম খাই, মেয়েটারে কি করি কন তো? কোন বাসায় দিয়া দিমু কিনা ভাবতেছি।
– এত ভাইবনা সলিম মিয়া। গন্তব্য উপরওয়ালাই ঠিক করে রাখছে। তোমার ভাবতে হবেনা।
– ঠিক কইছেন ভাইজান।
– সলিম মিয়া ঘুম আসতেছে খুব। দেখি একটু ঘুমাই তোমার ঘরে।
শুয়ে পড়লাম সলিম মিয়াদের চটের বিছানায়। সলিম মিয়ার মেয়ে একটা চাদর এনে দিলো।
ঘুমানোর সময় শুনতেছি সলিম মিয়া বলতেছে। “ভাইজানের তো অনেক জ্বর! কি যে করি.. হাসপাতালে নিতে হইবো.. কি না কি হইয়া যায়!”
– হ আব্বা। চলেন কাউরে বইলা হাসপাতালে নিয়া যাই।

ঘুমের মাঝে মুখে হাসি চলে আসলো। কে জানে সলিম মিয়া আর মেয়ে নিজেদের জ্বর হলে কখনও এভাবে ভেবেছে কিনা, চিন্তা করেছে কিনা? জীবন বড়ই রহস্যময়!

Comments

comments